বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা বৃদ্ধি পাওয়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সম্প্রতি প্রকাশ্যে আসামি ছিনতাইয়ের ঘটনা এবং পুলিশের ওপর সংঘবদ্ধ হামলার ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনায় পুলিশের সদস্যরা গুরুতর আহত হচ্ছেন এবং তাদের গাড়িও ভাঙচুর করা হচ্ছে।
পুলিশ সদর দফতরের অপরাধ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় ৪৪০টি মামলা দায়ের হয়েছে। আগের বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ৪৬২। যদিও মামলার সংখ্যা কিছুটা কমেছে, তবে সাম্প্রতিক সময়ে হামলার ধরন এবং প্রকাশ্যে আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ বেড়েছে। বিশেষ করে সেপ্টেম্বর, অক্টোবর ও নভেম্বরের প্রথম কয়েক দিনে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো এই উদ্বেগকে আরও বাড়িয়েছে।
পুলিশের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, পুলিশের ওপর হামলা এখন আর শুধু ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান কিংবা সন্ত্রাসীদের সঙ্গে সংঘর্ষে সীমাবদ্ধ নেই। নিয়মিত তল্লাশি, মাদকবিরোধী অভিযান, গ্রেফতারি পরোয়ানা কার্যকর এবং সংঘাত নিয়ন্ত্রণের সময়ও পুলিশ সদস্যরা হামলার শিকার হচ্ছেন। এসব ঘটনায় পুলিশের তাৎক্ষণিক আইন প্রয়োগের সক্ষমতা ও অভিযানের প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
গত শুক্রবার (৬ নভেম্বর) বগুড়ার সোনাতলার ফুলবাড়িয়া গ্রামে পুলিশের ওপর হামলা চালিয়ে প্রতারণা মামলার এক আসামিকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। এ সময় পুলিশের পিকআপ ভ্যান ভাঙচুর করা হয় এবং হামলায় পুলিশের কর্মকর্তাসহ তিন সদস্য আহত হন। পুলিশ এ ঘটনায় মামলা দায়ের করেছে এবং জড়িত থাকার অভিযোগে চার নারীকে গ্রেফতার করেছে।
গত ৯ জুন ঢাকার সাভারের বক্তারপুর এলাকায় মাদক মামলার পরোয়ানাভুক্ত আসামি রফিকুল ইসলামকে গ্রেফতার করতে গিয়ে হামলার শিকার হন সাভার মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) এস এম শামীম ও সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মশিউর রহমান খান। পুলিশ জানায়, আসামিকে হাতকড়া পরানোর চেষ্টা করলে তার সহযোগীরা ইট ও লাঠি নিয়ে হামলা চালায়। একপর্যায়ে ৪০ থেকে ৫০ জনের একটি দল হামলায় অংশ নেয় এবং গ্রেফতার আসামিকে ছিনিয়ে নেয়। এ ঘটনায় ১৭ জনের নাম উল্লেখ করে ৫৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। পরে পাঁচজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
জুলাইয়ে কক্সবাজারের কুতুবদিয়ায়ও একই ধরনের ঘটনা ঘটে। সেখানে গ্রেফতার এক আসামিকে থানায় নেওয়ার সময় প্রায় ৫০ জনের একটি দল পুলিশের ওপর হামলা চালায়। চার পুলিশ সদস্যকে মারধর করে হাতকড়া পরানো আসামিকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়। এ ঘটনায় ছয়জনকে গ্রেফতার এবং ৬৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা করার তথ্য জানায় পুলিশ।
গত ২ সেপ্টেম্বর সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জে একাধিক মামলার আসামি আসির মিয়াকে হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় তার স্বজন ও সহযোগীরা হামলা চালিয়ে তাকে ছিনিয়ে নেয়। পরে ওই আসামিকে পুনরায় গ্রেফতার করা হয়।
এছাড়া, গত শুক্রবার (৬ নভেম্বর) বিকেলে চট্টগ্রামে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিল থেকে পুলিশের ওপর হামলা, ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও পুলিশের একটি গাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে বন্দর থানার ওসিসহ ছয় পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। পুলিশ জানায়, বিকেলে হঠাৎ করে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা সেখানে মিছিল বের করেন। খবর পেয়ে পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে গিয়ে মিছিলে বাধা দেয়। এ সময় মিছিলকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন।
গত বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) রাতে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের তারাবো পৌরসভার উত্তর মাসাবো এলাকায় মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় আবুল কালাম নামে এক পুলিশ সদস্যকে নির্জন স্থানে ডেকে নিয়ে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে। হামলাকারীরা তাকে এলোপাতাড়ি পিটিয়ে হাত-পা ভেঙে দেওয়ার পাশাপাশি পায়ের রগ কেটে দিয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে যে, এসব ঘটনায় জড়িতদের রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে দ্রুত তদন্ত ও দৃশ্যমান বিচার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে পুলিশের পেশাদারত্ব, জবাবদিহি ও জনগণের সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক পুনর্গঠন জরুরি। অন্যথায় এ ধরনের ঘটনা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।





















